20 C
Düsseldorf

ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীর বেদনার চিত্র এবং অবৈধভাবে কাজ করার ঝুঁকি

Must read

গোলজার হোসাইন খান
গোলজার হোসাইন খান
আমি সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর একজন অবসরপ্রাপ্ত এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার।অতি সাধারণ মানুষ। কোন উচ্চাভিলাষ নেই। সাংসারিক বোধবুদ্ধি শূন্যের কোঠায়। হেরে যাওয়া মানুষের পাশে থাকি।এড়িয়ে চলি স্বার্থপরতা।বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হই সৃষ্টিশীল-পরিশ্রমী মানুষের প্রতি আর ভালবাসি আমার পেশাকে।

ফ্রান্সে সাধারণত রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দেওয়ার ছয় মাস পরে কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করা যায়। কিন্তু নানা কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব আবেদন বাতিল হতে পারে। অন্যদিকে, কাজের অনুমতি ছাড়া কাজ করা মানে বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়া। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক কাজের অনুমতি নেই এমন ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ করিয়ে কার্যত আইনের অপব্যবহার করে।

কয়েকবছর ধরে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বসবাস করা আলিওন ত্রাওরে অবৈধ হিসেবে কাজ করার সমস্যাগুলো বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন। তিনি জানান, “আমি শুরুতে ইটালিতে একটি টমেটো ক্ষেতে কাজ শুরু করি। সেখানে আমাকে নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার চেয়েও লম্বা একটি বাক্সে আমাকে টমেটো জমা করার কাজ দেয়া হয়েছিল, আর এজন্য আমাকে মাত্র ৫ ইউরোর বেতন দেয়া হতো। আমি কিছু পোলিশ এবং বুরকিনা ফাসো থেকে আসা অভিবাসীদের দেখেছি মাদক গ্রহণ করতে৷ মাদক নিয়ে তারা দীর্ঘসময় কাজ করতে পারতো, ফলে বেশি করে টমেটোর বাক্স ভর্তি করা সম্ভব হতো তাদের পক্ষে। আর এভাবে তারা দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ ইউরো পর্যন্ত আয় করতে পারতো।”

আলিওন ত্রাওরে তার সহকর্মীদেরকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হতে দেখেছেন৷ তারপক্ষেও একসময় মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের সাথে খাপ খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছিল না৷ তিনি বলেন, ”আমি ২০১১ সালে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে ইটালি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি কারণ সেখানে আমার কিছু পরিচিত বন্ধুবান্ধব ছিল।”

” ফ্রান্সে আসার পরে কাজের চুক্তি করতে অনিয়মিত অভিবাসীরা বৈধ অবস্থায় আছে এরকম কোন বন্ধু, আত্মীয় বা পরিবারের কারো আইডি এবং ডকুমেন্ট ধার করে থাকেন,” বলেন তিনি।

ত্রাওরে খুব দ্রুত একটি স্থাপনা নির্মাণকেন্দ্রে আরো ত্রিশজন অনিয়মিত অভিবাসীর সাথে কাজ খুঁজে পান, যেটি এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারলে সেটির মালিক কাজটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কেননা তিনি নিজেও একজন অনিয়মিত অভিবাসী ছিলেন।

এরপর ত্রাওরে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কষ্টসাধ্য বিভিন্ন শারীরিক পরিশ্রমের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিনি বলেন, ”পরে আমি একটি আফ্রিকান মুদির দোকানে কাজ খুঁজে পাই, সপ্তাহে ৬০ ঘন্টা শ্রমের বিপরীতে আমাকে মাসিক ১০০০ ইউরো বেতন দেয়া হতো। আমাকে হিসাব রক্ষণ,দোকান পরিষ্কার, দোকানের মালামাল সাজিয়ে রাখা থেকে শুরু করে সকল ধরনের কাজ করতে হতো। বেতনের তুলনায় যদিও পরিশ্রম ছিল অনেক বেশি, কিন্তু আমার হাতে আর কোন বিকল্প ছিল না। প্রত্যেক মাসে বেতন প্রদানের সময় মালিক কোন কারণ ছাড়াই বেতনের ২০০-৩০০ ইউরো রেখে দিত জমা হিসেবে। তিন মাসের মাথায় আলিওন দোকানের মালিককে কাজ ছেড়ে দেয়ার কথা জানায়”।

“কাজ ছেড়ে দেয়ার সময় আমি আমার প্রাপ্য ১১০০ ইউরো মালিকের কাছে দাবি করি,” বলেন ত্রাওরে৷

কিন্তু এর উত্তরে মালিক তাকে বলেন, “আমি টাকা না দিলে আপনি কি করতে পারবেন? আপনার এই দেশে থাকার বৈধ অনুমতি নেই সুতরাং আপনি চাইলেই পুলিশকে অভিযোগ জানাতে পারবেন না।”

” এটিই এখানে একজন অনিয়মিত অভিবাসীর জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা,” কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন তিনি।
ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন ফর আনডকুমেন্টেড মাইগ্রেন্ট এর কর্মী ফ্রসোঁয়াজ কারাজের সহায়তায় আলিওন ত্রাওরে তার পাওনা টাকা ফেরত পায়। মালিকের দ্বারা অনিয়মিত শ্রমিকদের প্রতি এধরনের আচরণ প্রায়ই ঘটে থাকে যদিও এক্ষেত্রে ধরা পড়লে মালিকের এক লক্ষ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক বা চাকুরিদাতারা মনে করেন, অনিয়মিত অভিবাসীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনের সহায়তা নিতে পারে না বৈধ কাগজপত্র না থাকার কারণে। অনেক সময় চাকুরিদাতা ভুয়া চেকও দেন শ্রমিকদের যা দিয়ে টাকা তোলা সম্ভব হয় না৷
অনিয়মিত অবস্থায় কাজের অনুমতি ছাড়া কাজ করলে নানা ধরনের সামাজিক এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও দেখা দেয়। অনিয়মিত অভিবাসীরা প্রায় সময়ই ভারি পরিশ্রমের কাজ করে থাকে যাতে দুর্ঘটনার আশংকা বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিত অভিবাসীরা রাষ্ট্রের মেডিকেল সাহায্য বা সাহায্যমূলক ‘এইড মেডিকেল’ পেয়ে থাকেন। কিন্তু বড় দূর্ঘটনার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কাজ করতে গিয়ে কারো পা বা হাত ভেঙে গেলে, যে পরিমাণ চিকিৎসা বিল আসে সেটি মেটাতে এইড মেডিকেল যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অভিবাসীরদের অধিকার নিয়ে কাজ সংস্থা বিএএএম এর সহ প্রতিষ্ঠাতা এবং আইনি পরামর্শক হেলোয়াস মারি।

অনেক সময় শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্ত বা বৈধ কাগজধারী অনেক অভিবাসীরাও লুকিয়ে কাজ করে থাকেন, বিশেষত যারা রাষ্ট্রীয় সামাজিক ভাতা গ্রহণ করেন৷ এক্ষেত্রে ধরা পড়লে নিয়োগকর্তার মতো চড়া জরিমানা দিতে হয় না, তবে রাষ্ট্রীয় যে সুবিধা তিনি নিয়েছিলেন তা ফেরত দিতে হয়৷

ফরাসি আইন অনুযায়ী, ফ্রান্সে আশ্রয় প্রার্থীরা আশ্রয় আবেদন করার ৬ মাস পর দেশটিতে কাজ করার আবেদন করতে পারেন৷ এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পরে কাজের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ এবং নিরুৎসাহজনক। “কাজের অনুমতি পাওয়ার জন্য আশ্রয়প্রার্থীকে অবশ্যই কোনও চাকরির প্রতিশ্রুতি বা একটি নিয়োগের চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে। ফরাসি সরকারের সূত্রমতে, কাজের অনুমতির সময়কাল আশ্রয়প্রার্থীর থাকার অনুমতির মেয়াদের সময়কাল অতিক্রম করতে পারবে না, যা সাধারণত ৬ মাস। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাজের অনুমতিটি নবায়নযোগ্য।

” বেশীরভাগ আশ্রয়প্রার্থী এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন না, কারণ অভিবাসীরা তাদের আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, যা ক্ষেত্রভেদে ছয় মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় নেয়,” বলেন হেলোয়াস মারি।

তিনি বলেন, ”এছাড়াও, বেশিরভাগ সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যালয়ে কাজের অনুমতি বিষয়ক আবেদনগুলো প্রায়ই পড়ে থাকে। অভিবাসীদের আবেদনের বিপরীতে কোন উত্তর দেয়া হয় না, যা স্পষ্টতই বৈধদেরকে কাজের অনুমতিবিহীন লোকদের শোষণ করতে উৎসাহিত করে।”

চাকুরির অনুমতিপ্রদান সংক্রান্ত সরকারি দপ্তরে পড়ে থাকা আশ্রয় আবেদনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের সুযোগ না থাকায় অনুমতিবিহীন অবৈধ কাজ অনেক ক্ষেত্রেই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়। এটিকে অভিবাসীরা নিয়মিতকরণের হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু, এটি একটি কঠিন প্রতিবন্ধকতা ।

”এর আগে অভিবাসীরা মূলত তাদের নামে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করত, কিন্তু ২০০৭ সালের সারকোজি আইন সকল প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ দপ্তর এর মাধ্যমে বিদেশিদের নথি পরীক্ষা করার জন্য নতুন একটি সিস্টেম তৈরি করে। যেটির আওতায় অনিয়মতি অভিবাসীরা যারা বৈধদের কাছ থেকে ”ধার বা ভাড়া” করা কাগজপত্র নিয়ে থাকেন তারাও অন্তর্ভুক্ত, আলিওন ত্রাওরে নিশ্চয়ই এভাবে কাজ করেছিল,” বলেন ফ্রঁসোয়াজ কারাজ।

তবে, এই সিস্টেমটিও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির সাথে জড়িত, ফ্রঁন্সোইয়াজ কারাজ সতর্ক করে বলেন, ”এটি খুব সাধারণ বিষয় যে আপনি যে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে কাগজ ভাড়া নিবেন, তাকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হবেন। কারণ তার নিজের চাকরি এবং আপনার করা চাকরি মিলিয়ে আয়ের দুটি উৎসের জন্য দ্বিগুণ কর দিতে হবে এবং তার সামাজিক সহায়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্রাস পাবে৷” এছাড়া যারা ২০১২ সালের ম্যানুয়েল ভালসের সার্কুলারের সহায়তায় অনিয়মিত থেকে নিয়মিত হওয়ার আশা করছেন তাদের জন্য আরো অসুবিধা রয়েছে। অনিবন্ধিত অভিবাসীদের নিয়মিতকরণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তাদের নামে কমপক্ষে ২৪, ১২ অথবা ৫টি বেতনের রশিদ জমা দিতে হয়। ”অর্থাৎ, আমরা এমন লোকদের কাছ থেকে বেতন-রশিদ চাচ্ছি যাদের কাজ করারই অনুমতি নেই। যেটি স্ববিরোধী এবং রাষ্ট্র এ সম্পর্কে অবগত,” মন্তব্য করেন ফ্রঁসোয়াজ কারাজ।

কিছু সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা ইতিমধ্যে মালি এবং সেনেগাল সফর করে এসেছেন সেখানকার লোকদের ইউরোপের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য।

” কিন্তু তাদেরকে বোঝানো খুব কঠিন একটি কাজ। তারা বাস্তবতা এবং আইনের বাইরে গিয়ে টিভিতে দেখানো খবরগুলো এবং তাদের যেসব আত্মীয়রা প্রতিমাসে ইউরোপ থেকে টাকা পাঠান তাদের কথা বেশি বিশ্বাস করে থাকে। তাদেরকে এটা বুঝানো যায় না যে, অনেক অভিবাসী ইউরোপে মানবেতর জীবন যাপন করেন এমনকি এক রুমে ৭/৮ জন করে থাকেন। যেটি অস্বাস্থকর এবং অনিরাপদ,”

অপরদিকে আলিওন ত্রাওরে এখনো ফ্রান্সে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তিনি ইতোমধ্যে প্রায় সাত বছর কাজ করেছেন। হয়ত এটির মাধ্যমে তার অনিয়মিত জীবন শেষ হয়ে বৈধ অভিবাসী হিসেবে নতুন জীবন শুরু হবে।

- Advertisement -spot_img

More articles

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ আপডেট