7.7 C
Düsseldorf

ফেরা

Must read

গোলজার হোসাইন খান
গোলজার হোসাইন খান
আমি সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর একজন অবসরপ্রাপ্ত এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার।অতি সাধারণ মানুষ। কোন উচ্চাভিলাষ নেই। সাংসারিক বোধবুদ্ধি শূন্যের কোঠায়। হেরে যাওয়া মানুষের পাশে থাকি।এড়িয়ে চলি স্বার্থপরতা।বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হই সৃষ্টিশীল-পরিশ্রমী মানুষের প্রতি আর ভালবাসি আমার পেশাকে।

আর মাত্র কয়েক মিনিট কিংবা তারও কম।সাদা এপ্রোন পরা ডাক্তার ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে আমার লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতে।নির্জীব দেহটা নিয়ে হাসপাতালের ধবধবে বিছানায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে আছি আজ ছয়দিন। ভেতরের কলকব্জায় মনে হয় পচন ধরে গেছে। বিস্ময়কর ভাবে শুধু মস্তিষ্কটা কাজ করছে ।সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। আমার অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ। মার মুখে শুনেছি আমি নাকি সময়ের আগেই আট মাসে জন্মেছিলাম ।তাই নামটাই হয়ে গেলো আটাশে। জন্মের পর জামিয়ার ডাক্তার তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু জলঢাকা বন্দরের শফিয়ার ডাক্তারের পরামর্শে আমাকে বেশ কয়েকদিন তুলার মধ্যে রাখা হয়েছিল বলেই নাকি রক্ষে। আমি সেই তুলা গুলোও দেখতে পাচ্ছি। এই বিছানার মতোই ধবধবে সাদা।

প্রথম যেদিন বগুলাগাড়ী প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেলেন আমার দিনমজুর বাবা সেদিন কি যে আনন্দ – উচ্ছাস ! হলুদের পাতা পোড়ানো ছাই গরম পানিতে দিয়ে গাউন এর হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট আগের দিন কেচে রেখেছিলেন মা ।ফলে তা এতটাই কুঁচকে গিয়েছিল যে অনেক টানাটানি করেও কোমরের নিচে নামানো যাচ্ছিল না।তাতে কি ?স্কুলে যাওয়ার আনন্দের কাছে জামা প্যান্টের বেদনা একেবারেই তুচ্ছ।আমাকে একটা ক্লাসে বসিয়ে দিয়ে বাবা চলে গেলেন ।সেটা যে দ্বিতীয় শ্রেণীর কক্ষ তা জানতাম না ।এক স্যার এসে একটা পদ্য পড়ালেন,”সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বেলা গেলো ওই। কোথা গেলো হাঁসগুলি তই তই তই ।হুঁয়া হুঁয়া ওই ডাকে শেয়াল ।”
হঠাৎ থেমে একজনকে হুঁয়া হুঁয়া বানান করতে বললেন ।অবাক কান্ড। কেউই বানানটা পারল না। শুরু হলো লিকলিকে বেতের সপাং সপাং ওঠানামা।আমার কাছে এসে বেত তুলেও নামিয়ে নিলেন ।আমার দুর্দশাগ্রস্ত জামা প্যান্ট এর কল্যাণে একটু মুচকি হেসে বললেন ,”তোকে তো এর আগে কখনো দেখি নাই । তুই কে?এখানে বসেছিস কেন ?”
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম,

-মোর নাম আটাশে। বাজান ইস্কুলে দিয়া গেছে তাই মুই এটে বইচু।
মার মুখে শুনে শুনে পদ্যটা মুখস্ত হয়েছিল ।আমি হড়বড় করে আবৃত্তি করলাম। আশ্চর্যজনকভাবে হুঁয়াহুঁয়া বানানটাও করে ফেললাম ।স্যার একটু অবাক হলেন ।আমাকে নিয়ে গেলেন হেড স্যারের কাছে। সবশুনে হেড স্যার বললেন,
-তোমার বাপের নাম কি?
– আয়হান।
– বানান করো তো গঙ্গাচরণ সাহা ।

সেটাও উতরে গেলাম ।পরে জেনেছিলাম স্কুলের থার্ড মাস্টার নামে পরিচিত এই স্যারের নাম গঙ্গা চরণ সাহা। আমার আর ছোট ওয়ান-বড় ওয়ানে পড়া হলো না। এক্কেবারে ক্লাস টু। জন্মের মত এখানেও যেন একটু তাড়াতাড়িই হয়ে গেল। স্যার আমার নাম পাল্টে খাতায় লিখে দিলেন আতশি রায়হান ।
সিনেমার মতো সবকিছুই একটার পর একটা চোখে ভাসছে যদিও চোখ স্থির ।কানাডায় স্কলারশিপ পাওয়ার পর পাসপোর্ট ভিসা প্রসেস এর জন্য হাজার কুড়ি টাকা কিছুতেই জোগাড় করতে পারছিলাম না ।শেষমেষ গঙ্গা স্যারের পরামর্শে কৃষি ঋণের জন্য ব্যাংকে গেলাম কিন্তু জমিজমা না থাকায় কেউই ঋন দিল না। অবশেষে সোনালী ব্যাংক জলঢাকা শাখার এক তরুণ প্রবেশনারি অফিসার জামিনদার হয়ে ১০০০০ টাকা ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই ব্যাংকে বাজানের নামে একটা হিসাব খুলে আমি টাকা পাঠাতাম।

বেশ কিছুদিন ধরেই মাথার যন্ত্রণাটা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার হাসিমুখেই জানালেন – ব্রেন টিউমার। যথাসম্ভব শীঘ্র অপারেশন করতে হবে। হলোও তাই ।কিন্তু মগজ এর ভেতর কি খোঁচাখুঁচিই করল – একেবারে অসাড় হয়ে গেলাম। আমার স্ত্রীকে ডাক্তার বলে গেলেন
-ওর পাশে বসে ওকে বারবার ডাকতে থাকুন। ঈশ্বর সহায় হলে সাড়া দিতেও পারে।

আমার পাশে বসে সে শুধু তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় আল্লাহকে ডাকতে লাগল। দেশী বিদেশী বন্ধু শুভাকাঙ্খীরা এলেন।দেখলেন। পরিণতি আঁচ করে সবাই”আহা উহু “করে চলে গেলেন ।ভার্সিটিতে আমার এক সিনিয়র। বাড়ি ডোমার।টরোন্টোতে বেশ প্রভাবশালী। তিনি এসে বললেন থ্রি ইডিয়েট ছবিতে রাজুকে যেভাবে জাগানো হয়েছিল এখানেও সেই থেরাপি কাজ করবে। আমার হাসি পেল। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও মানুষ সিনেমার সংলাপ শোনাতে চায়। বাফেলো সোলজার থেকে আসা এক বিদেশী সহকর্মী কয়েকবার “মিস্টার রায়হান। প্লিজ ওয়েক আপ “বলে চলে গেলেন ।আজ সকালে বাঙালি কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় কয়েকজন এসে আমার দাফন নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ডেড বডি দেশে পাঠাতে যে খরচ হবে তারচেয়ে অনেক কম খরচে এখানে সমাহিত করা যাবে। অনেকে আপত্তি জানালো ।আমার স্ত্রী বলল
-বাপ মা বেঁচে আছে তারা ছেলের মরা মুখটা দেখতে পাবেনা?

নেতা একটু গম্ভীর ভাবে বললেন,
মেসেজ পাঠায় দাও যে দেশে পাঠাতে হলে পচনরোধে শরীরে অ্যালকোহল পুশ করতে হবে যা ধর্মীয়ভাবে খুবই গর্হিত ।এজন্য আমরা এখানেই দাফন করবো। আল্লাহ সবখানেই আছেন ।
আমি শুনছি কিন্তু কিছুই বলতে পারিনি ।দুঃখ একটাই ।আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা দেশের অসহায় দুটা মানুষের জন্য কিছুই করে যেতে পারলাম না। মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাতাম ।কিভাবে যে তাদের দিন চলবে ।হয়তো সন্ধ্যায় সাত্তার মেম্বারের হোটেলে গিয়ে সিঙ্গারা খাওয়াটা আর হবে না। আবারও রশিদুল চেয়ারম্যানের বাড়িতে কামলা খাটতে হবে।
জন্ম, পড়াশোনা এমনকি জীবনের শেষটাও এত দ্রুত আসবে তা কখনো ভাবি নি ।ডাক্তার আমার খুব কাছে চলে এসেছেন ।মাস্কে ঢাকা থাকায় মুখটা দেখা যাচ্ছে না ।হঠাৎ মনে হল ওটা ডাক্তার না ।বেত হাতে এগিয়ে আসছেন গঙ্গা স্যার।আমি বসে আছি বগুলাগাড়ী প্রাইমারি স্কুলের সিট বেঞ্চে ।আতঙ্কে আওড়াতে লাগলাম,” সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো বেলা গেলো ওই।কোথা গেলো হাঁসগুলি তই তই তই ।”

- Advertisement -spot_img

More articles

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ আপডেট