16.3 C
Düsseldorf

জীবনের দৌড়

Must read

গোলজার হোসাইন খান
গোলজার হোসাইন খান
আমি সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর একজন অবসরপ্রাপ্ত এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার।অতি সাধারণ মানুষ। কোন উচ্চাভিলাষ নেই। সাংসারিক বোধবুদ্ধি শূন্যের কোঠায়। হেরে যাওয়া মানুষের পাশে থাকি।এড়িয়ে চলি স্বার্থপরতা।বিনম্র শ্রদ্ধায় নত হই সৃষ্টিশীল-পরিশ্রমী মানুষের প্রতি আর ভালবাসি আমার পেশাকে।

অন্ধকারে ঠাহর করা না গেলেও বুঝতে পারলাম – জোড় কব্বরটা পেরিয়ে এসেছি। সেই কবে মিলিটারিরা এখানে দু’ভাই কে মেরে ফেলে রেখে গিয়েছিল – এখনও নাকি কাউকে একা পেলে তারা কাতর কন্ঠে পানি চায়।এর কয়েক বছর পর পেয়ারা বেগম নামের সতেরো আঠারো বছরের এক তরুণীর গলাকাটা লাশ পড়েছিল এখানেই। সেও নাকি রাত-বিরেতে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে কিন্তু কাটা গলা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় তার ফোসফোসানির আওয়াজ নাকি এখনো মাঝেমধ্যে শোনা যায়।

ভয় তাড়াতে একটু আগের অপমানের খতিয়ান খোলার চেষ্টা করি।
কেন যে দুলাভাই এর কথায় রাজি হয়েছিলাম। এই করোনা কালে মানুষ জান হাতে নিয়ে ঘরবন্দী হয়ে আছে।আর তাদের হাউস হয়েছে আমার বিয়ে দেয়ার।আমি একা থাকি।খাওয়া দাওয়ার কষ্ট। এইসব আউল ফাউল কথা বলে মেয়ে দেখানোর তাল আরকি।মেয়েও নাকি রাজকন্যা হৈমবতী,গুনবতী।অনেক সয় সম্পত্তির মালিক বাবা-মা এর একমাত্র কন্যা হিসেবে তাকে ধনবতীও বলা যায়।বতীর যেন শেষ নাই। বোনের কাছেই মানুষ হয়েছি।তাই কথা ফেলতে পারিনি। রাতে মেয়ের বাড়ি এসে তো হতবাক।অনেক আয়োজন। মেয়ে পছন্দ হলে নাকি বিয়েও পড়ানো হবে। মৌলভী,কাজি সবাই রেডি।আমি ইয়েস বললেই তিন কথায় বিয়ে হয়ে যাবে। মেয়েপক্ষের রকমসকমে আমার মতামতের খুব একটা গুরুত্ব আছে বলে মনে হলো না।ফাঁদে পা পড়ে গেছে। আল্লাহ ছাড়া উদ্ধারের কেউ নেই।

হঠাৎই জনা চারেক লোক নভোচারীর মত করোনা সুরক্ষার পোশাকে দেবদূতের মত হাজির হয়ে পুলিশ বলে পরিচয় দিলেন। মনে হচ্ছিল আমি করোনায় মরে গেছি আর এরা এসেছেন দাফন করতে। আসল কেসটা অন্য। কে একজন থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছে যে এই বাড়ীতে বাল্য বিবাহ হচ্ছে। ওনারা সেটা বন্ধ করতে এসেছেন। মেয়ে পক্ষ তো হৈ হৈ করে উঠলো।না মোটেও না।মেয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে।করোনার কারনে আটকে আছে।বয়স আঠারো পার হয়ে গেছে। তবে টেকনিক্যাল কারনে সার্টিফিকেটে বয়স দু’বছর কমিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশ অফিসার এসব কাহিনি কানেই তুললেন না।আমার সামনে বসতে বসতে পকেট থেকে হাতকড়াটা বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। আমি বুঝে গেছি কি ঘটতে চলেছে।একটা ছোটখাটো সরকারি চাকরি করি।এরেস্ট হলে নির্ঘাৎ সেটা চলে যাবে।বিপদ আঁচ করে কোন ফাঁকে দুলাভাই সটকে পড়েছেন।
ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে ক্যামনে ক্যামনে জানি সব ম্যানেজ হয়ে গেল।পুলিশ ভাইয়েরা খাওয়া দাওয়া করলেন। মুখে পান দিয়ে সহাস্যে বললেন,কনে দেখা পর্বটা সেরেই যাই কি বলেন। শুভকাজে এটেন্ড করার মজাই আলাদা।আমাদের আবার পেট্রোল ডিউটি আছে।তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।

কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেল। কনের সাজ আর শেষ হয় না।বিদায় নেয়ার বাহানায় অফিসার ভেতর বাড়ি থেকে ঘুরে এসে আমাকে কানে কানে বললেন, ভাই জটিল কেস।মেয়ে ভাগছে।সু্যোগ বুঝে আপনিও কেটে পড়েন।
মেয়ের মামা আমার হাত চেপে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। আমি উদ্ভ্রান্তের মত দাঁড়িয়ে রইলাম।অফিসার তার পেশাগত স্টাইলে বললেন, এসব তো হরহামেশাই ঘটছে। আপনারা কেন যে মেয়ের পছন্দের গুরুত্ব দেন না।যাহোক কাল সকালে থানায় আসুন। বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জিডি করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
দেয়ালের ওপাশে এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতে জানালেন যে পরনে সাদা জামা, লাল সালোয়ার আর আকাশি রঙের ওড়না ছিল।
হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়ায় আঁধারে ডুবে গেল চারপাশ।আমিও যেন নিজকে চুরি করে পালানোর সুযোগ পেয়ে ছুটতে শুরু করলাম।

এত আতংকের মাঝেও মনে মনে একটা ছবি দাঁড় করাতে চাইলাম।আঠারো বছরের একটা মেয়েকে সাদা জামা,লাল সালোয়ার আর আকাশি রঙের ওড়নায় কেমন দেখাবে।
এখন রাত দুটা বাজে।আর আধা ঘন্টার মত হাঁটলেই মুলাডুলি স্টেশন। আন্তঃনগর নীলসাগর আসবে ভোরের কাছাকাছি সময়ে।বাকি সময়টা স্টেশনেই কাটিয়ে দেয়া যাবে। রাস্তার দুপাশে আখ ক্ষেত।ভয় আর অপমানের মিশেলে অন্ধকারকে একটু বেশিই গাঢ় মনে হচ্ছে। হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না।দাঁড়িয়ে পড়লাম।নাহ কোন শব্দ নেই।মনের ভুল ভেবে পা ফেলি।আবারও সেই পদশব্দ। এবার চট করে ঘুরে দাঁড়াই।অন্ধকার ছাড়া তো কিছুই চোখে পড়ে না।নিজের পায়ের শব্দ ভেবে জোরে পা চালাই।নতুন জুতোর মচমচে শব্দের তালে হারিয়ে যায় সব।এবার কি একটু ফোঁপানির আওয়াজ পেলাম।তাই তো মনে হলো।আতংকিত গলায় কাঁপা স্বরে শুধালাম, কে?
ঃআমি পেয়ারা।ফ্যাসফেসে নারী কন্ঠের জবাব।

আমার রক্ত হিম হয়ে গেল।এই কপালে ছিল।আমার জন্মের আগে ঘটে যাওয়া কোন এক পেয়ারা বেগমের প্রেতাত্মা শেষ মেষ আমাকেই খুঁজে পেলো।
নিমেষেই পৌরুষের আভিজাত্য আমাকে ধাতস্থ করে তুললো। ভয়কে জয় করে কর্তৃত্বের সুরে বললাম, কোন পেয়ারা। কোথায় যাবে।
ঃআমাকে চিনবেন না।আমি রেলস্টেশনে যাবো। ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললো।

-এত রাতে ওখানে কি কাজ তোমার।
– এত কথা কইতে পারবো না।এই জায়গাটা একটু ভয়ের। তাই আপনার পিছু নিয়েছি।
আরেকটু এগিয়ে ডানদিকে অন্ধকারে আঙুল তুলে আবার কান্না শুরু করলো।
– আবার কি হলো।আমি বিরক্তি প্রকাশ করলাম।
– ঐটা আমার কলেজ।
– এতে কান্নার কি আছে।
– হয়তো আর কখনও এই প্রিয় আঙিনায় আসা হবে না।সেটা ভেবেই চোখে পানি এলো।

মেয়ের মতলবটা আন্দাজ করে বললাম,
– তুমি কি কারো সাথে ট্রেন ধরতে যাচ্ছো।
– হ্যাঁ।সোজা সাপটা উত্তর।
– আপনিই বা কে।এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন। পাল্টা প্রশ্ন করলো সে।
– আমিও এখানে নতুন। যাচ্ছি স্টেশনে।

দুজনের গন্তব্য অভিন্ন।
সিএসডি পার হয়ে মুলাডুলী বাজারের নির্জন পথ পেরিয়ে একটি স্কুল। ওটা পেরুতেই আবার শুরু হলো কান্না।
– তুমি কি এই স্কুলেই পড়তে।
সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
গ্রামীণ পরিবেশে স্টেশনটা বেশ পরিচ্ছন্ন। ট্রেন আসতে এখনো ঘন্টা দেড়েক দেরী।লোকজন নাই বললেই চলে।একটা আধভাঙা চায়ের দোকানে কেটলিতে পানি চাপিয়ে ঝিমুচ্ছে দোকানী। বড় রেইনট্রি গাছের নীচে বেঞ্চিতে বসলাম।পাতার ফাঁকে আসা লাইটপোস্টের আলোয় মেয়েটার মুখ আবছা দেখা যাচ্ছে। চুপচাপ বসে আছি দুজন।কারো অপেক্ষায় আছে বলেও মনে হলো না। হঠাৎ বলে উঠলো,
– আমার ক্ষিধা লাগছে।

পাশের দোকানে পাউরুটি আর কলা ছাড়া কিছুই নাই।তাই আনতে গেলাম। দুর থেকে ভালো করে লক্ষ্য করলাম, একে কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। হয়তো পাশাপাশি কিছুক্ষণ হেঁটেছি, এক বেঞ্চে বসেছিলাম অনেকক্ষণ তাই চেনা চেনা লাগছে।

কলা আর পাউরুটি খাওয়ার ধরন দেখে ওর ক্ষিধের মাত্রাটা বুঝতে পারলাম।একটু মায়াও লাগলো।আহারে। কার বা আদরের খুকু-কোন প্রতারকের খপ্পরে পড়ে ঘর ছেড়েছে।
ঘন্টি বাজলো।ট্রেন ঈশ্বরদী ছেড়ে এসেছে। হয়তো মাঝগ্রামের কাছাকাছি। কয়েক মিনিটের মাথায় তীব্র আলো দৃশ্যমান হলো।ঝড়ের গতিতে ছুটে আসছে নীলসাগর।
সহসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা ট্রেনের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।ওর উদ্দেশ্য পরিস্কার।পেছন থেকে ছুটে চলা মেয়েটাকে ভালো করে দেখলাম আর চিনেও ফেললাম অকস্মাৎ। সাদা জামা আর লাল সালোয়ারে ছন্দোময় গতিতে ছুটছে সে।মাথার উপরে উড়ছে আকাশি রঙের ওড়না। আমিও দৌড়াতে শুরু করলাম পেছন পেছন। জীবনভর শুধু হেরেই গেছি।আজ এই ডেথ রেসে অন্তত জিততেই হবে।বেড়ে যাচ্ছে জীবনের গতি।
ট্রেন আর ওর মাঝের দুরত্বটা দ্রুতই কমে আসছে।

- Advertisement -spot_img

More articles

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে অনুগ্রহ করে আপনার নাম লিখুন

- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ আপডেট